তৌকির আহাম্মেদ,সাভারঃ
ঈদের ছুটি বৃদ্ধি ও চলতি মাসের বেতন, ওভারটাইম পরিশোধ এবং দাবি আদায়ে আন্দোলনের ঘটনায় আটক ৬ শ্রমিকের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সাভারে সড়ক অবরোধ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে তৈরী পোশাক শ্রমিকরা। এসময় কারখানা বন্ধের প্রতিবাদ জানিয়ে বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে শ্রমিকদের উপর হামলা-মামলার প্রতিবাদ জানিয়ে দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষের অপসারন দাবি করে এ বিক্ষোভ মিছিল করেছে তারা।
মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) সকালে সাভারের হেমায়েতপুর-সিঙ্গাইর-মানিকগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় জিন্স ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানী লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা।
সরেজমিনে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে সাভারের হেমায়েতপুর ঋষিপাড়া এলাকার জিন্স ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানী লিমিটেড কারখানার দুই হাজার শ্রমিক ঈদের ছুটি বৃদ্ধিসহ ওভারটাইম পরিশোধের দাবিতে আন্দোলনসহ কর্মবিরতী পালন করে আসছিলো। এ নিয়ে দফায় দফায় শ্রমিক ও মালিক পক্ষের সাথে আলোচনায় কোন সমাধান না হওয়ায় কারখানায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাংচুর, সহিংসতা ও মারামারি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরী করায় কোম্পানীর সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ১৩(১) অনুযায়ী মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানাটি বন্ধ ঘোষনা করেছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগদান করতে এসে কারখানা বন্ধের নোটিশ দেখে বিক্ষোভ করেছে। একপর্যায়ে শ্রমিকরা হেমায়েতপুর-সিঙ্গাইর-মানিকগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে রাখলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা এক ঘন্টা পর ঘটনাস্থলে পৌছে বিক্ষোদ্ধ শ্রমিকদেরকে সড়ক থেকে সড়িয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে। তবে বিক্ষোদ্ধ শ্রমিকরা এসময় সড়কের পাশের অবস্থায় নিয়ে দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যান।
কারখানাটির কোয়ালিটি শাখার নারী শ্রমিক নিলা আক্তার বলেন, এই মাসে ছুটি দিলে আমরা পুরো মাসের বেতনটা পাই। সেখানে মালিক পক্ষ বলেছে ২০ দিনের বেতন দিবে এবং ৮ দিনের ছুটি দিবে। আমরা দাবি করেছি ২০ দিনের বেতনের সাথে প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে ৪০ ঘন্টা ওভারটাইমের টাকা এবং ছুটি আরও ২ দিন বাড়াইয়া দিতে হবে। প্রয়োজনে আমরা ঈদের পরে এসে ২ দিন ছুটির যে ডিউটি সেটি করে দিবো। কিন্তু মালিকপক্ষ এতে রাজি না হয়ে ছুটি ১দিন বাড়াতে চাইলেও বেতন ২০ দিনেরই দিবে বলে জানায়। এঘটনায় কারখানার শ্রমিকরা দাবি আদায়ে কাজ বন্ধ করে কর্মবিরতী পালন করলে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সাথে আলোচনা করতে চায়। তাদের কথা অনুযায়ী সকল শ্রমিক একত্রিত হলে কারখানার জিএম অস্ত্রসহ বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে এসে কারখানার ভিতরে রাখে। যেখানে আমরা শ্রমিকরা সকালে আইডি কার্ড না দেখিয়ে কারখানায় প্রবেশ করতে পারিনা, সেখানে অস্ত্রধারী বহিরাগত লোকজন কিভাবে কারখানায় প্রবেশ করলো।
সুইং অপারেটর ইমরান বলেন, আমরা মালিক পক্ষের কাছে পুরো মাসের বেতন চেয়েছি কিন্তু মালিক পক্ষ বলছে ২০দিনের বেতন দিবে। এরপর আমরা বলেছি ২০দিনের বেতন দিয়ে ওভারটাইমের টাকা এবং ১০ দিন ছুটি দিতে হবে। কিন্তু মালিকপক্ষ আমাদের দাবি না মেনে উল্টো আন্দোলনের ঘটনা ৬৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং গত রাতে ৬ জন শ্রমিককে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে এরমধ্যে ২ জনের কোন খোজ পাওয়া যাচ্ছেনা।
অপর শ্রমিক শিউলি আক্তার বলেন, মালিকপক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে বহিরাগত লোকজন দিয়ে কারখানায় লুটপাট ও ক্ষতি করিয়ে আমাদের উপর দায় এবং বিরুদ্ধে মামলা দিবে। সোমবার বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে সেনাবাহিনী, পুলিশ আমাদের ডেকে জানায় আপনারা সবাই বাসায় চলে যান। মঙ্গলবার সকালে আমরা কারখানার মালিককে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধান করবো। এরমধ্যে কোন সমাধান না করেই রাতের বেলা পুলিশ আমাদের ৬ জন শ্রমিককে ধরে নিয়ে গেছে।
বিক্ষোদ্ধ শ্রমিকরা জানায়, জিএম কেন বহিরাগত লোক নিয়ে আসলো আমাদের মারার জন্য, আমাদের যে ৬ জনকে ধরে নিয়ে গেছে তাদেরকে ছেড়ে দিতে হবে এবং দাবি আদায়ে আন্দোলনের ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে মামলা হয়নি সেটি নিশ্চিত করতে হবে, আগামী ৬ মাসের মধ্যে কোন শ্রমিক ছাটাই করতে পারবেনা, আমাদের দাবি দাওয়া মেনে নিতে হবে এবং কোম্পানী চালাতে হলে পুরোনো ম্যানেজমেন্টকে পরিবর্তন করতে হবে।
শ্রমিকদের আটকের বিষয়ে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুয়েল মিঞা বলেন, কারখানায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ৪ জন শ্রমিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। তবে ৬ জন আটকের বিষয়টি সঠিক নয়।
এই প্রতিবেদন লেখার শেষ সময় দুপুর পর্যন্ত শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কারখানার সামনে অবস্থান নিয়ে আছেন। ভিতরে প্রশাসন ও কারখানা কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা চলছে।